রাজশাহী ব্যুরোঃ কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুরে বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। নদীর তীর ঘেঁষে চলছে এই অপরাধ। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় কৃষকদের শত শত বিঘা ফসলি জমি। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন বেআইনি কার্যক্রম চললেও জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙনের শঙ্কা, স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চরতারাপুর ইউনিয়নের আড়িয়াগোহাইলবাড়ি ও দিঘী গোয়াইলবাড়ি এলাকায় একাধিক পয়েন্টে ভেকু (এক্সকাভেটর) মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর তীর ঘেঁষে বালু কাটা হচ্ছে, যা মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ট্রাক এই বালু বহন করে জেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
মেহেদী নামে এক স্থানীয় এক কৃষক বলেন,
“নদীর পাড়ের জমিগুলো আমাদের একমাত্র সম্পদ। কিন্তু এই বালু খেকোদের কারণে আমাদের জমি দিন দিন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাধা দিলেও তারা হুমকি দেয়।”
বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে চলছে বালুর কারবার, স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি নেতা রহমত আলী শেখ, সুমন হোসেন, বিল্লাল শেখ, লাল শেখ, রাফি শেখ, সুজন শেখ, আমিরুল শেখ, আকরাম শেখ, আরিফ শেখ—এরা প্রত্যেকেই এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এছাড়াও ফারুক শেখ, মিজান মণ্ডল, সুরুজ মণ্ডল, হিলাল প্রোঃ, মিনাই প্রোঃ সহ আরও অনেকেই এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, কয়েক মাস আগেও চরতারাপুরে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে বালু উত্তোলন চলছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর তারা এই ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ালে বিএনপি নেতারা পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয়।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন,”আগে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা এই বালুর ব্যবসা করত, কিন্তু কিছু দুর্ঘটনার পর তারা পিছু হটেছে। এখন বিএনপির লোকজন পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু বিক্রি হচ্ছে, যার বড় অংশ সিন্ডিকেটের হাতে যাচ্ছে।”
বালু উত্তোলনের ফলে প্রাণহানি, প্রশাসনের নিরবতা” এলাকাবাসীরা অভিযোগ করেন, কয়েক মাস আগে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর পাশে তৈরি হওয়া গভীর গর্তে পড়ে তিন শিশু মারা যায়। এরপরও এই অবৈধ কাজ বন্ধ হয়নি।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন,
“বাচ্চারা খেলতে গিয়ে গর্তে পড়ে মারা গেছে, কিন্তু তাও এই দস্যুরা থামেনি। কারণ তাদের পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গডফাদার আছে।”
প্রশাসনের নিরব ভূমিকা, ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ” স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে এই অবৈধ ব্যবসা চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। তারা এলাকায় এসে বালু উত্তোলনকারীদের কাছে গিয়ে বলেন,
“কাটেন, আমরা পাহারা দিচ্ছি।”
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন,
“আমি বিষয়টি জানি না। এটা এসিল্যান্ডের বিষয়। আমরা খবর পেলে এসিল্যান্ড মহোদয়কে বলি। আপনারা একটু এসিল্যান্ডকে বলেন। তিনি আমাদের বললে আমরা প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট করবো।”
পাবনা সদর ভূমি সহকারী কমিশনার মোঃ নাহারুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই, তবে খোঁজ নিয়ে দেখছি এমন কিছু তথ্য পেলে আমরা অবশ্যই সেটার আইনগত ব্যবস্থা নিব কেউ অবৈধ কোন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছি আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জনসাধারণের দাবি—বালু উত্তোলন বন্ধ করুক প্রশাসন। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন যদি সত্যিকার অর্থে চায়, তাহলে এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে তারা হতাশ।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন,
“প্রশাসন চাইলে একদিনেই সব বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা টাকা খেয়ে চুপ থাকে। আমরা বিচার চাই।”
জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply